২০২৪ এর অভ্যুত্থান গণজাগরণ ও সম্ভাবনার দিশারী। ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানের পথে জনগণের শক্তি ও প্রতিবাদের আগুন ছিল বিজয়ের মাধ্যম।জুন এর ৫ তারিখ থেকে শুরু হয় এই গণ অভ্যুত্থান। এটি মূলত কোটা আন্দোলন এর দ্বিতীয় পর্যায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে কোটা আন্দোলনের সূচনা ঘটে। এই আন্দোলন বিচার বিভাগ পর্যন্ত পৌছালে তা আন্দোলনকারীদের পক্ষে রায় হয় । ২০২৪ এ এসে সেই রায় অবৈধ ঘোষিত হলে আবারো বিক্ষোভ এ ফেটে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।খুবই শান্তিপূর্ণভাবে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোটা প্রথা আমাদের সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম ছিল এই কোটা প্রথা। কোটা প্রথা চালু থাকায় মেধাবীরা পিছিয়ে পড়েছিল। তবুও বাঙালি জাতি ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদার আসনে রাখতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি মেনে নিয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। তাছাড়া রয়েছে নারী কোটা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা, তৃতীয় লিঙ্গ কোটা,পোষ্য কোটা ইত্যাদি। নারী কোটা চালু করা হয়েছিল নারীদের সমানতালে সমভাবে সমাজে কাজে লাগানোর জন্য। কোটা পদ্ধতি কতটা বাজে অবস্থায় গেলে এবং সমাজে কতটা বৈষম্য সৃষ্টি হলে ২০২৪ এর আন্দোলন এ সেই নারীরাই নিজেদের কোটা বাতিলের পক্ষে স্লোগান দেই? ২০২৪ এর গণ অভ্যুত্থানে নারীরা নিজেরা নিজেদের নারী কোটার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে এটাই প্রমাণ করেছে এই বাংলার বুকে কখনোই বৈষম্যের ঠাঁই হবে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ও মূল বিষয় ছিল বৈষম্য দূর করা। যখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সব ধরনের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল তখনই তারা জীবন দিয়ে অধিকার ফিরিয়ে এনেছিল। শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই নিজের ছেলে মেয়ে,নাতি নাতনি ও আত্মীয় স্বজনের জন্য রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা ও সমতা ফিরান নি, তারা সকলের অধিকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। হ্যাঁ, তাদের বীরত্বের পুরষ্কার অবশ্যই তাদের দেওয়া উচিত। তাই বলে বৈষম্য সৃষ্টি করে? তবে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মূল্য কোথায়? মুক্তিযোদ্ধা ভাতার বিরুদ্ধে কেউ কখনোই কথা বলেননি,কথা বলেন নি অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বেলায়। শুধুমাত্র কোটা প্রথা আমাদের সমাজে বৈষম্য নামক অভিশাপকে আবার ঠাঁই দিয়েছিল। তার উপর আছে পোষ্য কোটা যেটা সমাজে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল। পোষ্য কোটা মানেই "তেলের মাথায় তেল দেওয়া।" এটা এমনই প্রমাণ করে
"রাজার ছেলে রাজা হবে, চাষার ছেলে চাষা
রাজার নাতি সিংহাসনে আর চাষার নাতির করুণদশা"
অর্থাৎ তার বাবা ও চাকরি করবে সেই কোটায় সেও চাকরি করবে। যার বাবা কৃষক সে তার মেধাবী ছেলেকে কৃষক বানিয়ে তুলবে। কেননা তার তো কোনো চাকরি নেই ছেলেকে কিসের স্বপ্ন দেখাবে। অথচ আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নামক রাষ্ট্রে বসবাস করি যেখানে সাম্যের গান গাওয়া দরকার সবার। পোষ্য কোটা সম্পূর্ণই অযৌক্তিক। তবুও শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবি নিয়েই রাস্তায় নেমেছিল যে কোটা বাতিল না সংস্কার করা দরকার। ২০১৮ সালের পরিপত্র ঘোষণা করে কোটা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ২০২৪ এ এসে সেই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ।কথায় আছে না ক্ষমতা বেশিদিন হাতে থাকলে তা নিজস্ব আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ও তাই হয়েছে। কোটা আন্দোলনে প্রত্যেক দিনের ঘটা কাহিনী হালকা মাথায় থাকলেও আমার খাতায় রয়েছে সেই দিনের তারিখ ও সাপ্তাহিক বার । যা আমি গুরুত্বপূর্ণ দিন ভেবে খাতায় লিখে রাখছিলাম। সেই তারিখগুলোর আলোকে কয়েকটি দিনের আমার স্মৃতিতে গাঁথা কাহিনী আলোচনা করছি:
৫ জুন,২০২৪(সোমবার): সেদিন আমি ঈদুল আজহার ছুটিতে বাসায় যাবো বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। নিউজফিডে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখলাম সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্ত্বশাসিত ও আধা স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্পোরেশন এর চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (৯ম থেকে ১৩ তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। সেদিন সুন্দরবন এক্সপ্রেস এ বাসায় যাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম আমার তো কোটা নাই। বাবা কত কষ্ট করে আমায় পড়াশোনা করাচ্ছে আমাকে আরো অনেক অনেক পরিশ্রম করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। আবার ভাবছি ৫৬% যদি কোটায় চাকরি হয় তবে আমি কি পাবো একটা সরকারি চাকরি। প্রচুর হতাশা বুকে নিয়ে বাসায় গিয়েছিলাম হাসি মুখে। ছুটিতে বাসায় গেলে যে অনুভূতি পেতাম এইদিন কেন জানি কোনো ফিলিংস ছিল না।
৬ জুন,২০২৪(মঙ্গলবার): সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালে আদালতের দেওয়া রায়ের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং সেই সমাবেশে অংশ নেন বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী। উক্ত সমাবেশের খবর দেখে মনে অনেকটাই আনন্দ পেয়েছিলাম যে প্রতিবাদ যখন শিক্ষার্থীরা করছে এই রায় বাতিল করবেন এমন একটা আশা পেয়েছিলাম মনের মধ্যে। তখন চাপা হতাশা আমার মায়ের কাছে শেয়ার করেছিলাম। মা ও হতাশ হয়েছিলেন এবং মাকে বলেছিলাম দেখো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কত প্রতিবাদী তারা এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে।
৭ জুন,২০২৪(বুধবার): সেদিন কৌতুহল জাগলো সেই কোটা পদ্ধতির হাইকোর্টের রায় বাতিলে কি হলো এবং শিক্ষার্থীরা কোন অবস্থানে আছে সেটি দেখার জন্য। অনলাইনে চার্জ করতেই দেখি সেই সমাবেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে এবং সবার চোখেই এক অদ্ভূত স্বপ্ন। মনের ভিতরে এক অজানা সুখ ও অজানা কষ্ট উভয়ই কাজ করেছিল। এদিকে সরকার কোটা আন্দোলনকে অযৌক্তিক ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন- "যেহেতু উচ্চ আদালতে কোটা পুনর্বহালের রায় দিয়েছে সেহেতু এটা নিয়ে আন্দোলন করা সময়ের অপচয়।"
৯ জুন,২০২৪(শুক্রবার): অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না দেখে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কয়েকটি দাবি পেশ করেন। একই দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সম্মতি জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
১০ জুন,২০২৪(শনিবার):কোটা বাতিল-সংক্রান্ত বিভিন্ন মিছিল সমাবেশ এবং কোটা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দাবি চাওয়া হয় এবং সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে পুরো জুন জুড়ে ই।
১লা জুলাই,২০২৪(সোমবার): এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ এ ফেটে পড়ে এবং মিছিল সমাবেশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ৪ জুলাই এর মধ্যে দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাই এবং ৩ দিনের কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। পহেলা জুলাই থেকে আমি আর আমার মা কোটা আন্দোলনের আপডেট জানতে সবসময় মোবাইল, পত্রিকা ও টিভি নিয়ে বসে থাকতাম।
২ জুলাই,২০২৪(মঙ্গলবার): এইদিন শিক্ষার্থীরা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেইন রোড, রাস্তাঘাট অবরোধ করতে শুরু করে। সাধারণ জনগণ জ্যাম এ আটকে থেকেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিকে সমর্থন করেছিলেন।
৬ জুলাই,২০২৪(শনিবার): এইদিন শিক্ষার্থীরা" বাংলা ব্লকেড" নামক কর্মসূচি পালন করেন। যার মাধ্যমে সারাদেশের সড়ক মহাসড়ক অবরোধ করেন।
৭ জুলাই,২০২৪(রবিবার):এইদিন থেকে আমরা সকল ধরণের ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেই।
৮ জুলাই,২০২৪(সোমবার): প্রথম আলোর রিপোর্টে জানা যায়,ঢাকার ১১ টি স্থানে অবরোধ,৯ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ,৩ টি রেলপথ অবরোধ এবং ৬ টি মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
১০ জুলাই,২০২৪(বুধবার): ৪ সপ্তাহের জন্য রায় স্থগিত রাখলেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ আপিল বিভাগের পক্ষ থেকে ৭ আগস্ট রায় শুনানির সময় দেন আপিল বিভাগ। এদিকে সকাল - সন্ধ্যা বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির ঘোষণা শিক্ষার্থীদের।
১১ জুলাই,২০২৪(বৃহস্পতিবার): আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন - কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করছেন। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। তাছাড়াও সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন -শিক্ষার্থীরা লিমিট ক্রস করছে।
১৪ জুলাই,২০২৪(রবিবার): এই দিনটা ছিল আন্দোলন বেগবান করার একটি দিন। গণভবনের এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন এটি আদালতের রায়, নির্বাহী বিভাগের কিছু করার নেই। আমি কিছু করতে পারি না। এক পর্যায়ে এক সাংবাদিক এর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন - "মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা মেধাবী না, সব রাজাকারের নাতিপুতিরা হলো মেধাবী।"
এই বক্তব্যের পর আন্দোলনের গতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সারা দেশের শিক্ষার্থীসহ সকল স্তরের মানুষ ফুঁসে ওঠে। আগুন লেগে যায় রক্তে রক্তে,সিরায় সিরায়। শিক্ষার্থীরা স্লোগান তুলে
তুমি কে? আমি কে?
রাজাকার, রাজাকার
কে বলেছে? কে বলেছে
সরকার, সরকার
স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ছিল পুরো বাংলাদেশ।
১৫ জুলাই,২০২৪(সোমবার): এই দিন ই ছাত্রলীগের মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। শিক্ষার্থীরা আশ্রয় নিতে চাই নিরাপত্তা বাহিনী (পুলিশ) এর কাছে। পুলিশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা না দিয়ে সাহায্য করেছিলেন ছাত্রলীগ নামক সন্ত্রাসীদের। সেদিন রক্তের বন্যা বয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেদিন ছাত্রলীগের হাত থেকে রক্ষা পাই নাই কোনো নারী শিক্ষার্থী। সেদিনের একটি চিত্র মনে হয় এবং বুকের ভেতর কেপে ওঠে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটা আপু চিৎকার করে দৌড়াচ্ছে এবং পিছন থেকে ছাত্রলীগ নামক এক কাপুরুষ লাঠিচার্জ করছে। সেই দৃশ্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে দেখবো এবং আপনজনেরাই করবে তা কি কেউ কখনো কল্পনা করতে পেরেছে? রক্তের বন্যায় আবারো ভাসলো আমার সোনার বাংলা। আমরাই মনে হয় একমাত্র জাতি যারা রক্তের বিনিময়ে নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায় করি। জানি না অধিকার আদায়ে যুগে যুগে আর কতবার রক্ত দিতে হবে।
১৬,জুলাই,২০২৪(মঙ্গলবার): আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দল পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে গণহত্যা করেছে। শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়েছে এবং নিহত ও হয়েছে। সেদিন পুলিশের গুলিতে মারা যান রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর আবু সাঈদ।আবু সাঈদের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং বিক্ষোভ এ ফেটে পড়ে। আন্দোলনের স্লোগান পাল্টে যায় এবং কোটা আন্দোলন আর কোটা আন্দোলনে থাকে না। তারা বলে কোটা আন্দোলন কেন অন্য আন্দোলনে মোড় নিল সেখানে অন্য রাজনৈতিক দলের হাত আছে তবে তারা কি ভুলে গেল ?তারা কত মায়ের বুক খালি করেছে, তবে তারা কি তাও ভুলে গেছে? অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশি নয় তারা আমাদের ই মানুষ, তারা কি জানে না? কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং রক্ত ঝরানো কোনো মানুষই সহ্য করবে না। তারপর আন্দোলনের স্লোগান হলো- "শেখ হাসিনার অনেক গুণ, পুলিশ দিয়ে করছে খুন"
বিভিন্ন স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সারা শহর জুড়ে।
১৭ জুলাই ,২০২৪(বুধবার): সমানতালে হামলা চালানো হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর। বিমান দিয়ে গুলি চালানো হয় পুরো শহর জুড়ে। একে একে গুলিতে নিহত হন শিশু কিশোরসহ অনেকে। বন্ধ করে দেয়া হয় গার্মেন্টস ও সকল কর্মস্থল। দেশের সকল স্তরের মানুষ ফুঁসে উঠেছে এবং রাস্তায় নেমেছে। স্যোশাল মিডিয়ায় ও ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। সেদিন রাগে দুঃখে ব্যথিত হয়ে আমি ও স্যোশাল মিডিয়ায় আপলোড করলাম এক কবিতা:
মাগো শুনছো
কেমন করে কাঁদছে গো মা
গ্রামের ছোট্ট ঘরে
শহরে বুঝি ছেলে আমার
আন্দোলনেই গেছে মরে।
মায়ের মনে পাড়া প্রতিবেশী
সাহস জোগায় বেশ
তোমার ছেলেই উপহার দিবে
স্বাধীন বাংলাদেশ।
মাগো তুমি আর কেঁদো না
ভাই করেছে ফোন
এই বলিয়া চিৎকার করে
ভাইয়ের আদরের বোন।
ওপাশ থেকে ভাইয়া বলে
ওরে পাগলি শোন
দেশ বাঁচাতে রক্ত দিচ্ছে
তোর মতো হাজার বোন।
মাকে আমার সালাম দিস
শহীদ হবো ধরে নিস
বেঁচে ও যদি ফিরে আসি
দেশের মুখে ফুটবেই হাঁসি ।
মাগো শুনছো?
ভাইয়া নাকি শহীদ হবে
দেশের মানুষের তরে
আমরা বড়ই ভাগ্যবতী মা
সাহসী যোদ্ধার প্রিয়জন হয়ে।
একটুখানি হাসি দিয়ে
সাহস দিলেন মা
মায়ের দোয়ায় বিজয় তো একদিন
আসবেই ইনশাআল্লাহ ।
প্রতিবাদী পোস্ট আর কমেন্টস দেখে কিছু আওয়ামী দালাল মেসেজ করে ট্রেট দিয়েছিল আর বলেছিল এখনো সময় আছে এগুলো ডিলেট দাও না হয় খারাপ কিছুই হবে সামনে। তারা আমাদের খারাপ করতে এসে নিজেদেরই খারাপ করে দিলো। যাইহোক তারপর গণহত্যা চালাতে। এবং হত্যার খবর গোপন রাখতে এইদিন রাতে বন্ধ করে দিয়েছিল ইন্টারনেট। টানা ১০ দিন বন্ধ থাকে ইন্টারনেট এবং তার মধ্যে আরো শত শত প্রাণ ঝরে গেল।
১৮, জুলাই,২০২৪(বৃহস্পতিবার): সেদিন পানি খাওয়াইতে গিয়ে নিহত হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মীর মুগ্ধ। ইন্টারনেট থাকে বন্ধ।কোনো খবর দেখতে পাই না, মনটা আনচান আনচান করেছিল।রাতে ঘুম আসছিল না মনে হলো এই বুঝি ঝরে গেল আরেকটি প্রাণ। রাতের আঁধারে হামলা দিয়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করে কি জানি করতেছে। কত ভাবনা কত আতঙ্ক।
১৯ জুলাই,২০২৪(শুক্রবার): শিক্ষার্থীরা শাট ডাউন কর্মসূচি পালন করে এবং সর্বাত্মক ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এই দিনটাও আমার ভাই বোনের রক্তে রাঙানো ছিল পথ প্রান্তর।
২০জুলাই,২০২৪(শনিবার): কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনা মোতায়েন করা হয়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ হয় আসে।
২৭জুলাই,২০২৪(শনিবার): ছাপে পড়ে ইন্টারনেট ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সবাইকে উল্টাপাল্টা কথা বলা হয়েছে। সেদিন আমরা ইন্টারনেট পেয়ে প্রায় ১০ দিনে ঘটে যাওয়া আতঙ্কের শেষ দেখতে বসে পড়লাম মোবাইল হাতে। পুলিশের নির্যাতনের শিকার ছাত্র-ছাত্রীদের অবস্থা খুবই খারাপ লাগছিল। তারমধ্যে আবার হামলা ছেড়ে মামলা দেওয়া শুরু করলো। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাই বোনদের ধরে নেওয়ার ও খবর পায় এবং মরিয়া হয়ে যায়।
২৯ জুলাই,২০২৪(সোমবার): জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকার।৬ সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজতে রাখা হয় এবং মিথ্যা বিবৃতি ছড়ানো হয়।এবং ৩০ জুলাই নাকটবাজ সরকার আবার হত্যাকাণ্ডের শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল এটা যখন তারা সাথে সাথে লাল কাপড় মুখে বেঁধে নেমে পড়ে রাস্তায় এবং সাথে শিক্ষকরা ও যোগ দেন।
৩০ জুলাই,২০২৪(মঙ্গলবার): রাত ১২ কা বাজার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় অনলাইন যুদ্ধ। সকলেই লাল প্রোফাইল দিয়ে রক্তের মতো লাল করে দিল স্যোশাল মিডিয়া এবং সেই সাথে ফ্যাসিবাদী সরকারের মুখেও থুথু দিয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্ররা তার শোক পালনকে সবাই ধিক্কার জানাই।
৩১জুলাই,২০২৪(বুধবার):মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি পালন করে।এইদিন ফ্যাসিস্ট দল শিক্ষকদের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায় এবং শিক্ষকদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।
১আগস্ট,২০২৪(বৃহস্পতিবার): শুরু হয় আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়। মনের মাঝে বিজয়ের ঘন্টা বাজে। বাতাসে বাতাসে সুর পাই। যুদ্ধ চালিয়ে যাও বিজয় খুব কাছে। সেদিন আবেগে দুঃখে জড়িত এক মন নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করি-
" জুলাই আমার বিপ্লব, বিদ্রোহ ও চেতনা
আগস্ট আমাদের বিজয়, উৎসাহ ও স্বাধীনতা"
কেমন যেন আগস্টকে বিজয়ের মাস মনে হতে লাগলো। শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত জুলাইকে ভুলতে না পেরে রূপক অর্থে পহেলা আগস্টকে ৩২ জুলাই হিসেবে নির্বাচন করেন।
৪ ই আগস্ট,২০২৪(রবিবার): রক্তের বন্যা যেন শেষ হবার নয়। তবুও বিপ্লবী বিপ্লব চালিয়ে যেতে থাকে।৬ ই আগস্ট "লং মার্চ টু ঢাকা" কর্মসূচি ঘোষণা করে। এদিকে বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে বলে গ্রামের অলিগলিতে যে আন্দোলন হয় সেখানে যাওয়া শুরু করি এবং রাগে বিক্ষোভ এ চোখ লাল হয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ দলের হামলা, নালিশ এগুলো আর কি বলবো। তবে বিপ্লবীদের দমিয়ে দেওয়া এত সোজা না। ৫ ই আগস্ট আমাদের কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলায় অবস্থিত আগরপুর বাজারে কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ রোড অবরোধের ডাক দিয়েছে বড় ভাই ও বন্ধুরা। কিছুক্ষণ পরে শুনি ৫ ই আগস্ট আন্দোলন হবে না কারণ ৬ ই আগস্টের কর্মসূচি ৫ তারিখে পালিত হবে কারণ একদিন পিছিয়ে গেলে ঝড়ে যাবে আরো শত প্রাণ। তারুণ্যের সেরা উদ্যোগ ছিল এটা। যেখানে বলা হয়েছিল আগামীকাল নয় কালই লং মার্চ টু ঢাকা। এরমধ্যে কারফিউ জারি করা হয়। মানুষ কারফিউ ভেঙে দলে দলে ঢাকার দিকে রওনা দেয়। প্রত্যেকের চোখে তখন লাশের হিসাব নেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ দেখতে পাওয়া যায়।
৫ ই আগস্ট,২০২৪(সোমবার): রাতে আতঙ্কে, ক্ষোভে ঘুম হয়নি। সকালে কি হতে চলেছে মনের মধ্যে সেটাই ঘোরপাক খাচ্ছে। এদিকে বিপ্লবীরা সকল বাঁধা অতিক্রম করে রওয়ানা দেয় গণভবনের দিকে। সবার কাছে দোয়া চাইতে থাকি গণভবনে যাওয়া বিপ্লবীদের জন্য। মনের ভিতরে একটাই বাক্য উচ্চারিত হচ্ছে আল্লাহ তুমি রহমত করো, এই ফ্যাসিবাদী খুনি সরকারের হাত থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করো। কিছুক্ষণ পরে এক ফেসবুক পোস্ট দেখে মনটা শীতল হয়ে যায়। কারণ সেখানে দেখি ফ্যাসিবাদী সরকার শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে।হায়রে এমন শান্তি মনে হয় জীবনভর মেলেনি। আকাশে বাতাসে আনন্দের ধ্বনি। আমার মা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিল সেদিন। সেদিনটাকে সকলেই ৩৬ জুলাই হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এ জুলাই তো এখানেই শেষ হয়েছিল।কিন্তু এই আনন্দ কিছুক্ষণের মধ্যেই থমকে গেল। কেননা আমাদের বাড়ির পাশেই চেয়ারম্যানের বাড়ি। বহুদিন ক্ষোভ ধরে রাখা কয়েক দল এসে সেই বাড়ি ভাংচুর করা শুরু করে দেয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে । তার কিছুক্ষণ পরে আবার সেই বাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় সবকিছু। ভয় হচ্ছে এই দল না আবার সুযোগ পেয়ে পুরো এলাকা ভাংচুর করা শুরু করে। আশেপাশে শুধু ভাংচুরের শব্দ। এই আনন্দের দিনটা এভাবেই নষ্ট করে দিল একদল এসে। জানি না বাঙালি জাতি কবে সভ্য হবে। তবুও দিনটি আমার হৃদয়ে রয়ে যাবে আজীবন। একাত্তরের বিজয়ের স্বাদ কেমন ছিল সেদিন উপভোগ করেছিলাম।
৮ ই আগস্ট,২০২৪(বৃহস্পতিবার): চারদিকে ভাংচুর এর ফলে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা সমতায় ফেরাতে শিক্ষার্থীরা উদ্যোগ নেয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে নেমে পড়ে শিক্ষার্থীরা। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করেন এই অদম্য শিক্ষার্থীরা। দিনটি আমার খুব প্রিয় একটি দিন। এই দিন আমি ভাইসহ আমার বন্ধুরা মিলে উপজেলায় সকল বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার সাথে মিটিং করি এবং সকল ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহায্য নেই থানা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে। ভাবতে খুবই ভালো লাগে যে ইউএনও সম্পূর্ণভাবে আমাদের সমর্থন করেন এবং আমাদের কাজ বাস্তবায়ন এ সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং সেই সাথে তিনি আমাদের সাথে বাজারে ঘুরে ঘুরে বাজার মনিটরিং এর কাজ করেন। সেদিন ইউএনও এর সাথে মিটিং এর একটা স্থিরচিত্র নিচে শেয়ার করলাম:
সবশেষে বলতে চাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তই আমার স্মৃতিতে গাঁথা রয়েছে। মন গহীনে আজীবন রেকর্ড থাকবে তারুণ্যের এই দারুন ইতিহাস। এখন বাংলাদেশের উচিত তারুণ্যের এই গণ অভ্যুত্থানকে কাজে লাগানো। তবেই পাবো প্রকৃত বিজয়ের স্বাদ। ভালো থাকুক বাংলাদেশ ।
লেখক:
নাম:রুনা লায়লা
বিভাগ: রাষ্ট্রবিজ্ঞান
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
ইমেইল: runalailaghs@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :