মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে, তখন তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েল। ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি মৌখিক সমর্থন জানালেও দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কিংবা তার সরকার প্রকাশ্যে কড়া কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতাই ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী কঠোর অবস্থান নেতানিয়াহুর কাছে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা ড্যানি সিত্রিনোভিচ মনে করেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের জন্য এই মুহূর্তকে সবচেয়ে অনুকূল সময় হিসেবে বিবেচনা করছে তেল আবিব।
ইসরায়েলের সাবেক সিগন্যাল গোয়েন্দা কর্মকর্তা আসাফ কোহেনের মতে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবেই নেতৃত্বের ভূমিকায় যাচ্ছে না। তাদের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্রই সরাসরি এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেবে। কারণ সামরিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব—সব দিক থেকেই ওয়াশিংটন অনেক বেশি শক্তিশালী।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীরব সমন্বয়
ইসরায়েলের নীরবতার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান শ্লোমি বাইন্ডার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, ওই বৈঠকে ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে সংযমের কথা বললেও আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের সরকার পরিবর্তনমূলক অভিযানের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার মতে, সীমিত হামলা ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে বর্তমান ইরানি সরকার টিকে যেতে পারে।
এর আগেও নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত বছর একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই বার্তা দেন।
ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য লাভ
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে—সীমিত সামরিক হামলা থেকে শুরু করে পূর্ণমাত্রার সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত। যদিও ইউরোপসহ অনেক মিত্র দেশ সতর্ক করে বলছে, ইরানে সরকার উৎখাত গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, তবু ইসরায়েলের ভেতরে একে নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরায়েলের ধারণা, তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহসহ ইরানসমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তিও দুর্বল হবে।
তবে দেশটির কিছু রাজনীতিক মনে করেন, সীমিত হামলা বা নতুন কোনো সমঝোতা উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিরোধী দল ইয়েশ আতিদের সংসদ সদস্য মোশে তুর-পাজের ভাষায়, “পূর্ণমাত্রার হুমকির মোকাবিলা কখনো আংশিকভাবে করা যায় না।”
প্রতিশোধের আশঙ্কা ও বড় ঝুঁকি
গত বছরের ১২ দিনের সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এর কিছু ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে, এতে বহু প্রাণহানি ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান এখন আবারও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত বাড়াচ্ছে। ইরানের শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন, নতুন কোনো হামলা হলে নজিরবিহীন প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
ড্যানি সিত্রিনোভিচের মতে, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—ইসরায়েল আবার হামলার শিকার হবে, কিন্তু ইরানে সরকার পরিবর্তন হবে না। তার দৃষ্টিতে, ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি স্থায়ীভাবে দূর করতে হলে সরকার পরিবর্তন জরুরি, যা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব।
সুযোগ নাকি ভয়ংকর জুয়া
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল, আঞ্চলিক প্রভাব কমেছে এবং দেশের ভেতরে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে—এই পরিস্থিতি অনেকের কাছে একবারের সুযোগ হিসেবে ধরা দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে রয়েছে বড় ঝুঁকি। ইরানের ক্ষমতার কাঠামো এখনো ভেঙে পড়েনি, বিরোধী আন্দোলন বিভক্ত, আর সরকার পতনের পর কে ক্ষমতায় আসবে—তা অনিশ্চিত।
নেতানিয়াহু নিজেও রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে। আসন্ন নির্বাচনে নিজের ‘নিরাপত্তার নেতা’ ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করতে ইরান ইস্যু তার জন্য বড় বাজি হয়ে উঠতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর—আর সেটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

আপনার মতামত লিখুন :