আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করা হবে কি না—এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। তবে প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, আপাতত র্যাব বিলুপ্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং বাহিনীটিকে পুনর্গঠন ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি র্যাবের জন্য নতুন যানবাহন কেনার সরকারি অনুমোদনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে—র্যাব কি বিলুপ্তির পথে, নাকি নীরবে পুনর্গঠনের দিকে এগোচ্ছে? তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
পুনর্গঠনের ইঙ্গিত
র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একটি বিশেষায়িত এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, গুম ও ক্রসফায়ারের মতো বিতর্কিত অধ্যায় থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মাধ্যমে র্যাবকে নতুনভাবে সাজানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাহিনীটির কাঠামো পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী থেকে ডেপুটেশনে কর্মকর্তা নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। ভবিষ্যতে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটের আদলে র্যাব পরিচালনার ধারণাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে র্যাবের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নিখোঁজের ঘটনায় র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আসছে। বিশেষ করে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তীব্র হয়। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা উঠে আসে।
গুম কমিশনের সুপারিশ
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে র্যাবকে গুমের ঘটনায় জড়িত প্রধান বাহিনীগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, র্যাবসহ অন্যান্য বাহিনীতে সংযুক্ত সামরিক সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
কমিশনের সিনিয়র সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত পুলিশের হওয়া উচিত। তার মতে, সরকার যদি র্যাব বহাল রাখতেই চায়, তাহলে এটিকে শুধুমাত্র পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে একটি পেশাদার বিশেষ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
সরকারের অবস্থান
বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার বলেছেন, দেশে একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেটি বিদ্যমান র্যাবের মাধ্যমে হবে, নাকি নতুন কাঠামোয় পরিচালিত হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য র্যাবকে বিলুপ্ত করা নয়; বরং বাহিনীটির জবাবদিহি ও আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করা। তাই ভবিষ্যতে র্যাব টিকে থাকলেও এর কার্যক্রম ও নেতৃত্ব কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :