ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

ঢাকার গণপরিবহন এখন যেন জীবাণুর চলন্ত উৎস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬, ০৯:৪৪ সকাল

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকা-র গণপরিবহনে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত। কিন্তু যাত্রীসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাত এখন অনেকের কাছেই পরিণত হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির আরেক নাম হিসেবে। অপরিষ্কার সিট, ধুলো-ময়লায় ভরা হ্যান্ডেল, দুর্গন্ধযুক্ত বাসের ভেতর এবং দীর্ঘদিন অযত্নে থাকা কাভার নিয়ে বাড়ছে যাত্রীদের উদ্বেগ।

বাড্ডার বাসিন্দা রিংকু দাস প্রতিদিন অফিসে যেতে বাস ব্যবহার করেন। তার অভিযোগ, অনেক বাসের সিটে বসলেই গা গুলিয়ে ওঠে। সিটের কাভারে ধুলোর স্তর জমে থাকে, হাত দিলেই ময়লা লেগে যায়। বাসের ভেতরে এক ধরনের উৎকট গন্ধও থাকে, যা দীর্ঘ সময় সহ্য করা কঠিন। এজন্য তিনি এখন নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করলেও সিট বা হ্যান্ডেলের স্পর্শ এড়িয়ে চলা সম্ভব হয় না।

শুধু রিংকু দাস নন, রাজধানীর অসংখ্য যাত্রী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বাসের সিট, জানালা কিংবা হাতল নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। অনেক সিটের কাভার ছেঁড়া, ভেতরের স্পঞ্জ বের হয়ে আছে, কোথাও আবার শুকিয়ে থাকা বমির দাগ ও দুর্গন্ধ রয়ে গেছে।

যাত্রীদের মতে, প্রতিদিন হাজারো মানুষ একই সিট ও হ্যান্ডেল ব্যবহার করলেও জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে এসব গণপরিবহন এখন বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

কলেজছাত্রী মাহমুদা আফরোজ জানান, একবার তিনি বাসের হেলপারকে সিট পরিষ্কার করতে বললে উল্টো বিরূপ আচরণের শিকার হন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী সাইদুর রহমানের অভিযোগ, অনেক বাসের স্যাঁতসেঁতে সিট ও দুর্গন্ধে যাতায়াত করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

পোশাককর্মী সুলতানা বেগম বলেন, প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে বাসের সিট কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হয়। তবুও শরীরে দুর্গন্ধ লেগে থাকে।

তবে যাত্রীদের এসব অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের দাবি, প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ওঠানামা করায় সব সময় পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না। কিছু পরিবহনের কর্মীরা জানিয়েছেন, রাতে গ্যারেজে নেওয়ার আগে ভেজা কাপড় দিয়ে অন্তত সিট মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, যাত্রীসংখ্যা বেশি এবং গাড়ির চাপের কারণে নিয়মিত ধোয়া-মোছার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। যদিও বছরে এক বা দুইবার সিট কাভার পরিবর্তনের দাবি করেছেন কয়েকজন পরিবহন ব্যবস্থাপক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু অস্বস্তির কারণ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি।

রিয়াজুল ইসলাম, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ-এর মেডিসিন ও চর্মরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, জানান—নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার না করলে বাসের সিট ও হাতলের মাধ্যমে ফ্লু, সর্দি-কাশি, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, স্ক্যাবিস, চর্মরোগ এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রতিদিন বাস গ্যারেজ থেকে বের হওয়ার আগে সিট, জানালা ও হাতল জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা জরুরি।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি-র মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, অধিকাংশ পরিবহন মালিক যাত্রীসেবার চেয়ে আয়কেই বেশি গুরুত্ব দেন। তার মতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জরুরি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ফিটনেসবিহীন ও অস্বাস্থ্যকর যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার, ছেঁড়া সিট পরিবর্তন, যাত্রীবান্ধব আচরণ এবং কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।

Link copied!