কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবারের বোরো মৌসুমে ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকরা। জমিতে ধানের ফলনও হয়েছিল আশানুরূপ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। এখন সেই ঋণ শোধ করবেন, নাকি পরিবার চালাবেন—এমন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।
অষ্টগ্রামের কৃষক আজমল মিয়া জানান, প্রায় তিন একর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। তিনি বলেন, সামান্য সহায়তা দিয়ে এত বড় ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তার মতো অনেক কৃষকেরই লাখ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে।
ইটনার কৃষক কামরুল ইসলামের কণ্ঠে ছিল হতাশা। তিনি বলেন, ঋণের কিস্তি পরিশোধ আর সংসার চালানোর চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না। সরকার সহায়তার আশ্বাস দিলেও এখনও হাতে কোনো অর্থ পৌঁছায়নি। তালিকা তৈরির কাজ চললেও বাস্তব সহায়তা কবে মিলবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকার তিন মাসের প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে সেটি এখনও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে কৃষকদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই শেষে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর বরাদ্দ অনুমোদন হলে কৃষকদের মধ্যে সহায়তা বিতরণ করা হবে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে তিন ক্যাটাগরিতে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা পাঁচ হাজার টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তরা আড়াই হাজার টাকা করে তিন মাস সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি প্রতি মাসে ২০ কেজি চালও দেওয়া হবে।
এদিকে সুনামগঞ্জেও হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার ১৩৭টি হাওরে এবার ২ লাখ ২৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। প্রাথমিক হিসাবে ২০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জে প্রায় ৯৮ হাজার কৃষকের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সহায়তার তালিকা তৈরিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চলছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন বঞ্চিত না হন, সে দাবিও তুলেছেন তারা।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, শুধু নগদ সহায়তা নয়, আগামী মৌসুমে কৃষকদের সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ দিয়েও সহযোগিতা করতে হবে। একইসঙ্গে ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচিও প্রয়োজন।
কৃষকদের আশা, দ্রুত সহায়তা পৌঁছালে অন্তত পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কিছুটা সহজ হবে। তবে তাদের প্রশ্ন—প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা কতটা কার্যকর হবে।

আপনার মতামত লিখুন :