ঢাকা শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
ঋণের চাপে অর্থনীতি, বিনিয়োগে ভাটা

বাজেটের সামনে বড় সংকটে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬, ০৩:২৩ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে চাপ, জ্বালানি সংকট, কমে যাওয়া বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারের বাড়তি ঋণনির্ভরতা—সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার শুধু বড় বাজেট দিলেই হবে না; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। কয়েক মাস আগেও এই হার ছিল ৬ শতাংশের ওপরে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন কমছে, উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং উৎপাদন সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে। উচ্চ সুদহার পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে অনেক শিল্পঋণের সুদ ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা উৎপাদনমুখী ব্যবসার জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। তার মতে, ব্যবসার খরচ কমানো ছাড়া বিনিয়োগে গতি ফিরবে না। বিশেষ করে জ্বালানির দাম ও ঋণের সুদ সহনীয় পর্যায়ে আনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই তা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের আগেই সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়েছে ব্যাংক খাত থেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা কার্যত ঋণবঞ্চিত হয়ে পড়ছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হচ্ছে “ক্রাউডিং আউট” পরিস্থিতি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো তাদের বড় অংশের অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে, কারণ সেখানে ঝুঁকি কম এবং মুনাফা নিশ্চিত। ফলে শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, সরকার এখন সহজ সমাধান হিসেবে ব্যাংক ঋণের পথ বেছে নিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও ব্যবসা পরিচালনার মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, লজিস্টিক দুর্বলতা, জ্বালানি ঘাটতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এখনও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে।

এদিকে ব্যাংক খাতেও বাড়ছে খেলাপিঋণের চাপ। অতীতের ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের ঘটনার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বড় ঋণ তদারকিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণের তথ্য বিশেষভাবে যাচাই করা হচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাতে যে অনিয়মের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে না আনলে অর্থনীতির চাপ আরও বাড়বে।

বর্তমানে মূল্যস্ফীতিও সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যপণ্যের উচ্চ দাম মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। তবে অতিরিক্ত সংকোচনমূলক নীতি নিলে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন বাজেটে করজাল সম্প্রসারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, উৎপাদনমুখী খাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি, খেলাপিঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতের জন্য সাশ্রয়ী ঋণ নিশ্চিত করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত স্থিতিশীলতা তৈরি করাও জরুরি।

তাদের ভাষায়, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যেখানে শুধু বড় অঙ্কের বাজেট ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

Link copied!