চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন ধরনের ভয়ংকর সাইবার প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মোবাইল ফোনে রহস্যজনক নোটিফিকেশন কিংবা ভুয়া ‘সিস্টেম আপডেট’-এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ফোনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। এরপর ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে মুহূর্তেই হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারকেরা অত্যাধুনিক ম্যালওয়্যার ও রিমোট অ্যাকসেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ফোনে প্রবেশ করছে। শুরুতে ব্যবহারকারীদের ফোনে একটি সতর্কবার্তা বা নোটিফিকেশন ভেসে ওঠে। সেখানে কখনও বলা হয় অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটা হয়েছে, আবার কখনও দ্রুত ব্যালেন্স যাচাই করার অনুরোধ জানানো হয়। অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে সেটি বন্ধ করে দেন। কিন্তু এরপরই ফোনের স্ক্রিনে দেখা যায় ‘ইনস্টলিং সিস্টেম আপডেট’ লেখা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যবহারকারীরা ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একবার ম্যালওয়্যার ফোনে প্রবেশ করলে সেটি ব্যবহারকারীর স্ক্রিন, এসএমএস, নোটিফিকেশন, এমনকি আঙুলের স্পর্শও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। ফলে কেউ ব্যাংকিং অ্যাপ চালু করলেই গোপনে পিন, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি সংগ্রহ করে নেয় চক্রটি। পরে বিভিন্ন অপরিচিত অ্যাকাউন্টে ধাপে ধাপে টাকা স্থানান্তর করা হয়।
গত কয়েক মাসে শুধু চট্টগ্রামেই এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
সাতকানিয়ার ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দীন সম্প্রতি এমন প্রতারণার শিকার হন। তিনি জানান, মোবাইলে আসা একটি নোটিফিকেশন উপেক্ষা করার পর তার ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হতে শুরু করে। পরে তিনি দেখেন, ফোনের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরবর্তীতে জানতে পারেন, তার জিমেইল ও গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে সংরক্ষিত ব্যাংক তথ্য ও পিন কোড ব্যবহার করে প্রতারকেরা ইউসিবি ব্যাংকের দুটি হিসাব থেকে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা সরিয়ে নিয়েছে।
একইভাবে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কর্মরত আবুল কালাম ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘নেক্সাস পে’ অ্যাপ ব্যবহার করতে গিয়ে দেখতে পান তার পাঁচ বছরের সঞ্চিত দুই লাখ টাকা গায়েব। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, টাকা একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নগরের চকবাজার এলাকার ব্যবসায়ী রাহুল সেনও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার অজান্তেই ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। অপরিচিত লিংক, পপআপ নোটিফিকেশন কিংবা সন্দেহজনক অ্যাপ ইনস্টল করলেই ফোন ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বাইরের উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করলে এমন হামলার আশঙ্কা আরও বাড়ে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার জালিয়াতি। তবে সচেতনতা বাড়ানো গেলে অনেক প্রতারণাই ঠেকানো সম্ভব। তারা ব্যবহারকারীদের অজানা নোটিফিকেশন বা লিংকে ক্লিক না করা, ফোনে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ না রাখা এবং ব্যাংকিং তথ্য কোথাও সংরক্ষণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোনে হঠাৎ অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করতে হবে, ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে ব্লক করতে হবে এবং নিকটস্থ থানার সাইবার ইউনিট বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :